বেসরকারি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সিলেট শাখায় দুই প্রবাসী বাংলাদেশির কষ্টে জমানো ৯০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে লন্ডন প্রবাসী ওই দুই গ্রাহকের সঞ্চয়ী হিসাব জামানত হিসেবে দেখিয়ে অন্য গ্রাহকের নামে ঋণ দেওয়া হয়। সেই ঋণ এক পর্যায়ে খেলাপি হয়ে পড়লে দুই প্রবাসীর জমানো টাকা থেকেই তা আদায় করা হয়েছে। লন্ডন থেকে গ্রাহকের অভিযোগের পর প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করে ব্যাংক শাখা। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে দেখা যায়, ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ব্যাংক শেষ পর্যন্ত দায়ও স্বীকার করেছে। গ্রাহক এখনও তার টাকা ফেরত পাননি।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএএম জাকারিয়া অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরে সমকালকে বলেন, এটি এক বছর আগের ঘটনা। এফডিআর জামানত রেখে সঞ্চয়কারীদের সম্মতির ভিত্তিতে ঋণ নেওয়ার প্রমাণ ব্যাংকের কাছে আছে। এখন তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া এ বিষয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। এক গ্রাহকের সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা জামানত দেখিয়ে অন্য গ্রাহককে ঋণ দেওয়া ও অনিয়ম না হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন কেন জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে পারেননি।ব্যাংকে জমা দুই প্রবাসীর ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সম্প্রতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সিলেট শাখা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের তথ্য মতে, শাহ আমীর আলী ও মুকিত নামে দু'জন লন্ডন প্রবাসী ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের সিলেট শাখায় বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্প খোলেন। ছয় বছরে দ্বিগুণ মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্পে আমীর আলী ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২০ লাখ টাকা রাখেন। তার সঞ্চয়ের মেয়াদপূর্তি হয়েছে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তার পাওয়ারকথা ৪০ লাখ টাকা। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে একই প্রকল্পে ২৫ লাখ টাকা রাখেন মুকিত। তার সঞ্চয়ের মেয়াদপূর্তি হয়েছে এ বছরের জানুয়ারিতে। ব্যাংকের কাছে তার পাওনা ৫০ লাখ টাকা। মেয়াদ শেষে দু'জনের পৃথক সঞ্চয় হিসাবে টাকা জমা হওয়ার কথা। তারা অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স দেখেই হতবাক। দেখা যায়, অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। এর কারণ জানতে চাইলে প্রথমে শাখা থেকে বিভিন্ন ছলচাতুরতার পর জানানো হয়, তারা জামানতকারী ছিলেন। এখন ঋণখেলাপি হয়ে পড়ায় তাদের জমানো সঞ্চয় থেকে তা সমন্বয় করা হয়েছে। অথচ এই ঋণের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, দুই অ্যাকাউন্টধারীকে না জানিয়ে তাদের সঞ্চয়ী হিসাব জামানত রেখে স্থানীয় ব্যবসায়ী গোলাম হাদী ছাইফুলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সিলমুন কনসোর্টিয়ামকে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। কিছু টাকা পরিশোধের পর সিলমুন কনসোর্টিয়াম খেলাপি হয়ে পড়ে। সিলমুন কনসোর্টিয়ামের কাছে এখন ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ওই দুই ব্যক্তির সঞ্চয় হিসাব জামানত দেখানোর ফলে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ তারা পাচ্ছেন না। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যের সঞ্চয়ী হিসাব 'জামানত' হিসেবে দেখাতে হলে হিসাবধারীর লিখিত সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। শাখায় এ ধরনের একটি ডকুমেন্ট থাকলেও তা ভুয়া বলে পরিদর্শক দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। কেননা সম্মতিপত্রে যে তারিখে স্বাক্ষর রয়েছে সেই সময়ে ওই দুই সঞ্চয়কারী লন্ডনে ছিলেন। অ্যাকাউন্টের স্বাক্ষরের সঙ্গে সম্মতিপত্রের স্বাক্ষরের মিলও নেই। দু'জনের স্বাক্ষর জাল করে শাখা থেকে ভুুয়া সম্মতিপত্র তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বরখাস্ত সে সময়ের শাখা ব্যবস্থাপক নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগসাজশ করে কৌশলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন বর্তমানে বরিশাল শাখায় কর্মরত সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার সৈয়দ মাহবুব-ই-এলাহী, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আকবর হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার সামসুল আলম চৌধুরী ও জুনিয়র অফিসার শওকত মাহমুদ চৌধুরী। সামসুল আলম চৌধুরী এখন ইউসিবিএলে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও পাওনাদারের অর্থ পরিশোধে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংককে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাঠানো চিঠিতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জানাতে বলা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে ব্যাংক বলেছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়াজ আহমেদ চৌধুরীকে আগেই বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আকবর হোসেন, সৈয়দ মাহবুব-ই-এলাহী, সামসুল আলম চৌধুরী ও শওকত মাহমুদ চৌধুরীর ইনক্রিমেন্টসহ বিভিন্ন সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে অর্থঋণ আদালতে একটি মামলাও করা হয়েছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য তিন মাস সময় প্রয়োজন। তবে তিন মাসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা হবে কি-না তা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।

No comments:
Post a Comment